টেবিলের এপাশে বসে মাঝ ফেব্রুয়ারি মাসের ঠাণ্ডা সকালেও আমি ঘেমে যাচ্ছিলাম। কিছুতেই এগুতে পারছি না! উল্টোপাশে বসে আছেন বাংলাদেশের একজন বরেণ্য ব্যাক্তি। বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপক ডাঃ এ কে আজাদ খান। অবিশ্বাস্য মেধাবী একজন মানুষ!
দিনটি ছিল ১৫ই ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ইং সাল। আমি এসেছিলাম ওনাকে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে ডায়বেটিস রোগ সারিয়ে ফেলা সম্ভব হয়েছে, সেই খবর দিতে। ভেবেছিলাম, বাংলাদেশ ডায়বেটিক সমিতির সভাপতি হিসাবে তিনি বিশেষ আগ্রহী হবেন। সেদিন দেখা করার আগে ওনাকে হাতে হাতে একটি চিঠিও দিয়েছিলাম এই বিষয়ে দলিল দিয়ে (https://docs.google.com/document/d/1WEd29h48LYIytJIdqEYxFzDGhDyIj9QYcoq9xgqlLWg/edit?usp=sharing)। ফোনেও কথা হয়েছিল। আমি খুব আশা করেছিলাম যে উনি বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন কেননা পুরো দেশ জুড়ে ডায়বেটিস চিকিৎসায় বৈপ্লবিক ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ যুক্ত ছিল। কিন্তু অনুভব করলাম যে তিনি বিরোধী অবস্থান নিয়েছেন। তবে, এমন দায়িত্ববান একটি পদে কর্মরত একজন ব্যক্তিকে সব কিছুই যাচাই করে নিতে হয়; মুখের কথা তো বটেই, এমনকি দলিল প্রমাণকেও যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তাই এই বিরোধিতাও আমি খারাপ চোখে দেখিনি। কিন্তু খোলা মনে তিনি প্রশ্ন করবেন এবং যাচাই সাপেক্ষে উপযুক্ত তথ্য প্রমাণ পেলে তার অবস্থান পরিবর্তন করবেন এবং সেই আলোকে বাংলাদেশ ডায়বেটিক সমিতিকে নেতৃত্ব দেবেন, এইটুকু মনে মনে আশা করেছিলাম।
দুর্ভাগ্য আমার এবং আমার দেশের! সেদিন ওনার খোলা মনের দেখা আমি পাইনি। তবে সমস্যা আরো একটা ছিল। দেখুন, এমনিতেই আমি গুছিয়ে কথা বলতে পারি না। তার উপরে এমন হল যে, আমি একটি বাক্য বলে শেষ করার আগেই তিনি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বেশ কয়েকটি ভুল ধরিয়ে দিয়ে, প্রতিটি ভুল নিয়ে আলোচনা করতে শুরু করছিলেন। অবস্থা এমন হল যে, আমার ভুলের ব্যাখ্যা শুনতে গিয়ে আমি নিজের কথাই ভুলে গেছি! অর্থাৎ, আমার কথাগুলো বলে শেষ করতেই পারছিলাম না! ঘেমে যাবারই কথা, তাই না?
শেষে ভাবলাম আমার যুক্তি/তর্ক দিয়ে কাজ হবে না। বরং একজন ব্রিটিশ ডাক্তার যিনি তার রোগীদের ডায়বেটিস সারিয়ে (খাদ্যাভ্যাস মেনে চললে, রোগীর কোন ঔষধ খেতে হচ্ছে না এবং রক্তে চিনির মাত্রা থাকছে স্বাভাবিক) দিয়ে, তার কৌশল সম্পর্কে ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন, তার সাথে কথা বললে উনি নিশ্চয়ই সকল প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেবেন এবং অধ্যাপক আজাদ খান তার চিকিৎসা কৌশল সম্পর্কে জেনে আমাদের দেশের ডায়বেটিক রোগীদের সেবায় এই তথ্য ব্যবহার করতে পারবেন। তাই প্রস্তাব করলাম যে আমি ডাঃ ডেভিড আনউইনের সাথে অধ্যাপক খান কে কথা বলিয়ে দেব যেন তিনি বিস্তারিত জেনে নিতে পারেন।
ডাঃ ডেভিড আনউইন! সামান্য একজন জেনারেল প্রাক্টিশনার ছিলেন। চিকিৎসক হিসাবে জীবনের প্রথম ২৫ বছর তিনি টাইপ ২ ডায়বেটিক রোগীদের গৎবাঁধা চিকিৎসাই দিয়ে গেছেন, চিনি খেতে নিষেধ করেছেন, অল্প অল্প করে ৫/৭ বার শর্করা সহ খাবার খেতে বলেছেন, ব্যায়াম করতে বলেছেন, নিয়মিত ঔষধ ও ইনসুলিন নিতে বলেছেন ইত্যাদি এবং একজন রোগীকেও রোগ মুক্ত করতে পারেন নি। ডাক্তার হয়েছিলেন মানব সেবার উদ্দেশ্যে। তাই ২৫ বছর একই ধারায় কাজ করে তিনি হয়ে পরেছিলেন ক্লান্ত আর হতাশ এবং ভাবছিলেন যে রোগী দেখা বন্ধ করে দেবেন। এমন সময় একটি ঘটনা তার জীবন বদলে দিল!
দশ বছরেরও বেশী সময় ধরে তিনি একজন মহিলা রোগীর স্থূলতা এবং ২য় ধরনের ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসা উপদেশ দিয়ে আসছিলেন। অন্য সকলের মতোই ওনার ওজন কিছুতেই কমছিল না এবং ডায়বেটিস ধীরে ধীরে খারাপই হচ্ছিল। প্রতি ৩ মাস অন্তর রোগী এসে ওনার সাথে দেখা করে প্রেসক্রিপশন নিয়ে যেতেন। হঠাৎ সেই রোগী ওনার কাছে আসা বন্ধ করে দিলো এবং ৬ মাসেরও বেশী সময় তার প্রেসক্রিপশন নিতে এলো না। কম্পিউটার যখন ডাঃ আনউইন কে এই বিষয়ে সজাগ করল, তিনি সেই রোগী কে ফোন করে দেখা করতে বললেন এবং দিনক্ষণ স্থির করে দিলেন।
পূর্ব নির্ধারিত সেই সময়ে যে মহিলা ডাক্তারের চেম্বারে প্রবেশ করলেন, ডাক্তার তাকে দেখে বিভ্রান্ত হয়ে গেলেন। আসার কথা একজন স্থূল রোগীর যিনি কোনরকম হাচর-পাচর করে বহু কষ্টে দরজা দিয়ে ঢোকেন; অথচ রোগী ঢুকছেন একজন যিনি মোটেও স্থূল নন এবং দুর্বলতার কোন চিহ্ন নেই তার চলাফেরায়! তিনি ভাবলেন যে অন্য কোন রোগী হয়তো সুযোগ বুঝে ঢুকে পড়েছে! তিনি একটু বিরক্ত হয়েই রোগীকে বললেন যে তিনি মিসেস অমুকের জন্য অপেক্ষা করছেন এবং এই রোগী যেন এপয়েন্টমেন্ট নিয়ে পরে আসেন। বেড়িয়ে যাবার পরিবর্তে রোগী ওনার সামনে চেয়ারে বসে চোখ লাল করে বললেন যে তিনিই মিসেস অমুক! কথা শুনে ডাক্তার কোন রকম চেয়ার থেকে পড়ে যাওয়া সামলালেন, কিন্তু ওনার চোয়াল ঝুলে পড়ল, মুখ হা হয়ে গেল! তিনি ভালো করে মিলিয়ে দেখলেন যে, রোগী মিসেস অমুক-ই বটে! ওনার এমন উন্নতি কি করে হল?
নিজের কৌতূহল ধরে রাখতে পারলেন না তিনি। রোগীর স্বাস্থ্যের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে তিনি জিজ্ঞেস করলেন যে, কিভাবে রোগী এমন পরিবর্তন করলেন? জবাব শুনে ওনার গলা শুকিয়ে গেল! কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামও জমতে শুরু করল। মিসেস অমুক বললেন, "আপনি আমাকে যে উপদেশ দিয়েছেন, তার ঠিক উল্টো কাজ করে আমার আজ এই অবস্থা! আপনি বারবার অল্প করে খেতে বলেছিলেন, আমি দিনে ৩ বেলার বাইরে কিচ্ছু খাই না; আপনি প্রতি বেলা খাবারে খানিক শর্করা খেতে বলেছিলেন, আমি এখন শর্করামুক্ত খাবার খাই; আপনার উপদেশের মধ্যে চিনি খেতে নিষেধ করাটাই একমাত্র উপকারী উপদেশ ছিল আমার মনে হয়। আমার সন্দেহ হয় যে আপনি আসলে পাস করা ডাক্তার কিনা; দেখুন আপনি আমাকে মিষ্টি চিনি খেতে নিষেধ করেছেন যেন রক্তে চিনির মাত্রা না বাড়ে, অথচ প্রতি বেলা খাবারের সাথে রুটি, বিস্কুট ইত্যাদি খেতে বলেছেন! আপনি কি জানেন না যে, শর্করা খাবার হজম হয়ে গ্লুকোজে পরিণত হয় এবং রক্তের গ্লুকোজ বাড়ায়? এই কথা তো স্কুলের বাচ্চারাও জানে!"
"সর্বনাশ করেছে রে! রোগী অভিযোগ দাখিল করবে মনে হচ্ছে!"- ভাবলেন ডাক্তার আনউইন। "আমি ডাক্তার, আমি সব জানি" ভাবটা সযত্নে পরিত্যাগ করে তিনি খুব নরম সুরে রোগীর কাছে স্বীকার করলেন যে, তিনি এই রোগের সঠিক চিকিৎসা হিসাবে যা শিখে এসেছিলেন, সেই মতেই চিকিৎসা দিয়েছেন। সাথে তিনি বিনীতভাবে রোগীর কাছ থেকে জানতে চাইলেন যে তিনি ঠিক কি করেছেন। বুঝিয়ে বললেন যে, তার কাছে আসা আরো শত শত রোগীকে তিনি হয়তো এই কৌশল ব্যবহার করে সাহায্য করতে পারবেন!
রোগী এবারে একটু নরম হয়ে বুঝিয়ে বললেন যে, তিনি খাবার থেকে শর্করা বাদ দিয়ে তার পরিবর্তে চর্বি খাওয়া বাড়িয়েছেন এবং তাতেই এই ফল। ডাক্তার আনউইন নিজের কান কে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। চর্বি বেশী খাচ্ছেন রোগী! হার্ট অ্যাটাক হবে তো! রোগী ওনাকে অভয় দিয়ে বললেন যে, প্রায় চল্লিশ হাজার ডায়বেটিক রোগী বছরের পর বছর ধরে এই কৌশল ব্যবহার করে সুস্থ আছেন। তাদের ওজন স্বাভাবিক, ডায়বেটিস নেই এবং তারা কর্মঠ জীবন উপভোগ করছেন প্রতিদিন! ডাক্তার আনউইন ভাবলেন, বিষয়টা খতিয়ে দেখার দরকার! শুরু হল তার জীবন বদলের যাত্রা!
মেডিকেল বই ঘেঁটে এবং বিভিন্ন গবেষণাপত্র পড়ে তিনি দেখলেন যে তার রোগী সঠিক কাজই করেছেন। ডায়বেটিস আক্রান্ত রোগীর দেহ শর্করা খাবার থেকে পাওয়া বিশাল পরিমাণের গ্লুকোজ সহ্য করতে পারে না। এককালে যে গ্লুকোজ এক নিমেষেই দেহ রক্ত থেকে সরিয়ে ফেলতে পারতো, এখন সেই গ্লুকোজই রোগীর দেহে বিষের মতো ক্ষতি করে। চিকিৎসা হিসাবে রোগীকে বারবার শর্করা খাবার খেতে উপদেশ দিয়ে তিনি আসলে রোগীর দেহে সারাদিন ধরে বিষ প্রয়োগ করে আসছিলেন! কিন্তু শর্করা না খেলে এবং সাথে চর্বি বাড়িয়ে খেলে কোন ক্ষতি হয় কিনা, সেই বিহয়ে তিনি একটু দুশ্চিন্তায় ছিলেন। ভাবলেন, নিজেই একবার পরীক্ষা করে দেখবেন। ফলাফলে অনুভব করলেন যেন তার বয়স দশ বছর কমে গেছে! ওজন একটু কমলো, উচ্চ রক্তচাপ সেরে গেল, দুপুরের পর থেকে ঘুম ঘুম ভাব কেটে গেল, রাতে গভীর ঘুম হতে লাগলো, নাক ডাকা বন্ধ হল ইত্যাদি অনেক অবিশ্বাস্য উপকার পেলেন তিনি।
ভাবলেন সহকর্মী ডাক্তারদের বিষয়টি বুঝিয়ে বললে তারা আগ্রহী হবেন এবং রোগীদের কি করে এই কৌশল ব্যবহার করে চিকিৎসা দেয়া যায়, সেই বিষয়ে একত্রে কাজ করতে পারবেন! ফল হল ঠিক উল্টো! সাহায্য তো পেলেনই না, বরং বিভিন্ন রকমের হাসি-ঠাট্টার শিকার হতে শুরু করলেন। তার সহকর্মীগন সোজা বলে দিলেন যে, ওনারা গাইডলাইন বিরোধী এমন চিকিৎসা রোগীদের দিবেন না!
কিন্তু তিনি হাল ছাড়লেন না। চল্লিশ হাজার রোগীর অভিজ্ঞতাকে তিনি অস্বীকার করবেন কি করে? নিজের স্ত্রী এবং অন্য একজন নার্স এর সহায়তা নিয়ে সন্ধ্যার পরে বিনামূল্যে তিনি তার 'প্রি ডায়বেটিক' রোগীদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে ডায়বেটিস মুক্ত হবার কৌশল শেখাতে শুরু করলেন। অতি অল্প সময়েই কয়েকজন রোগী তাদের ডায়বেটিস মুক্ত হয়ে গেলেন! ডাক্তার আনউইনের আনন্দ দেখে কে!
তিনি ডাক্তারদের একটি কনফারেন্সে তার সফলতার কথা উপস্থাপন করলেন! ডাক্তারদের মধ্যে জুতো ছুড়ে মারার চল নেই বিধায় শ্রোতারা তাকে জুতো মারলেন না বটে, কিন্তু সেই ঘাটতি ভাষা ব্যবহার করে পুষিয়ে দিলেন। তার বক্তব্যে বাধা দিয়ে তাকে স্টেজ থেকে নামিয়ে দিলেন, তাকে 'কোয়াক' বলে অবিহিত করলেন ইত্যাদি! মনে ভীষণ আঘাত পেলেন। বিজ্ঞানকে অনুসরণ করার দাবীদার তার সহকর্মীদের বিজ্ঞানবিমুখী এমন আচরন দেখে খুব হতাশ হলেন। সামান্য একজন জিপি ডাক্তার, ডাক্তারদের সমাজের বিরুদ্ধে তিনি কি করে দাঁড়াবেন?
ওদিকে একের পর এক রোগী ভালো হতে থাকল তার চিকিৎসায়! তিনি তখন ডায়বেটিস আক্রান্ত রোগীদেরকেও নিজ খরচে ডায়বেটিস মুক্ত হবার পথ দেখিয়ে যেতে থাকলেন। এতো এতো বছর পরে, তার উপদেশ অনুসরণ করে মানুষ রোগমুক্ত হচ্ছে। ঠিক এই কাজটি করার আশায়ই তিনি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন! জনসেবার নেশা পেয়ে বসল তাকে! যাকে বলে 'ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো'!
যে রোগীদের তিনি চিকিৎসা দিচ্ছিলেন, তাদের উপাত্তগুলো তিনি একটি হিসাবের খাতায় লিপিবদ্ধ করে রাখছিলেন। তার জিপি-র পরিসংখ্যানবিদ তাকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন কি করে উপাত্ত সংগ্রহ করতে হয়। সেই উপাত্ত পর্যালোচনা করে তিনি দেখলেন যে তার চিকিৎসায় প্রায় অর্ধেক রোগী ডায়বেটিস উপশম করতে সক্ষম হচ্ছিলেন। তার ইচ্ছে হল তার এই সাফল্যের খবর সারাদুনিয়াকে জানানোর। সাহায্য চাইলেন কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডায়বেটিস গবেষক প্রফেসর ডাঃ রয় টেইলরের। জার্নালে প্রকাশ করলেন তার সফলতার কথা! চিকিতসকগন শুরুতে বিশেষ আগ্রহ না দেখালেও, সাধারন মানুষের মধ্যে তার প্রকাশিত গবেষণা খুব জনপ্রিয়তা পেল। ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালের সবচেয়ে জনপ্রিয় গবেষণাপত্রের তালিকায় ছিল সেটি। সেই গবেষণার সাম্প্রতিক রূপ দেখতে পাবেন এই ঠিকানায়ঃ https://nutrition.bmj.com/content/bmjnph/early/2023/01/02/bmjnph-2022-000544.full.pdf
যেন দীর্ঘ একটি ঝড় ঝঞ্ঝার রাতের পরে তার জীবনে ঝলমলে একটি দিন এলো। সাধারন মানুষকে টাইপ ২ ডায়বেটিসের অভিশাপমুক্ত করতে তিনি এতটাই আগ্রহী এবং নিবেদিত প্রাণ যে, সম্মানীর তোয়াক্কা না করেই তিনি বিভিন্ন মহলে মানুষকে শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন! এখন তার অনেক সম্মান, অনেক সাফল্য (পোস্ট এর ছবিতে দেখুন)। তার অত্যন্ত সহজ খাদ্য কৌশল ব্যবহার করে দেশে বিদেশে হাজার হাজার মানুষ উপকৃত হচ্ছেন এবং হয়েছেন। বিবিসি তার কাজ নিয়ে প্রামাণ্য চিত্র নির্মাণ করেছে। গার্ডিয়ান এবং ডেইলি মেইল পত্রিকায় নিয়মিত তার লেখা ছাপা হয়। দেশ বিদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীকে তিনি ডায়বেটিসের অভিশাপ থেকে উপশম পাবার পথ দেখাচ্ছেন অথবা প্রতিরোধের কৌশল বাতলে দিচ্ছেন! ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসও তার কাজ কে তাদের বিভিন্ন হাসপাতালে ব্যবহার করতে শুরু করেছে! এক বিশাল সাফল্য। কিন্তু এখনো মানুষটা সেই একই রকম বিনয়ী এবং ডায়বেটিস থেকে মানুষকে বাঁচানোর কাজে ভূমিকা রাখার সুযোগ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়েন!
সামান্য একজন জিপি...তবুও একজন খাঁটি মানবদরদী বীর! পৃথিবীজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন কে স্থূলতা এবং ডায়বেটিস রোগের অভিশাপ মুক্ত করেছেন তিনি! স্যালুট!
ওহ আচ্ছা! যে কথা থেকে ডাক্তার ডেভিড আনউইন এর কথা বলতে শুরু করেছিলাম, তা হল যে আমি আমাদের জাতীয় অধ্যাপক ডাঃ এ কে আজাদ খান কে ডাঃ ডেভিড আনউইন এর সাথে ইমেইলে যোগাযোগ করিয়ে দেবার প্রস্তাব করেছিলাম যেন তিনি সরাসরি কথা বলে বিষয়টি ভালো করে বুঝতে পারেন। অধ্যাপক আজাদ খান সে প্রস্তাবে রাজি হয়ে ওনার নিজের ইমেইল ঠিকানা আমাকে দিয়েছিলেন। দেরি না করেই আমি ডাক্তার আনউইনের সাথে যোগাযোগ করে, অধ্যাপক আজাদ খান এর ইমেইল ঠিকানা তাকে দিয়ে, অনুরোধ করি যেন তিনি অধ্যাপক আজাদ খান এর সাথে আলাপ শুরু করেন এবং ডায়বেটিস উপশমে তার অভিজ্ঞতা জানান।
ঠিক পরের দিনই ডাঃ আনউইন ইমেইল করলেন (আমাকে যুক্ত করে পাঠিয়েছিলেন এবং পোস্ট এর ছবিতে দেখুন) এবং ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত তার পেপারটির সারমর্ম এবং লিংক পাঠিয়ে আলাপ শুরু করলেন। ওনার ইমেল দেখে আমি তো খুব খুশী! ভাবলাম এবারে নিশ্চয়ই অর্থবহ আলোচনা এবং অগ্রগতি হবে। কিন্তু দুনিয়ার রকমটাই এমন যে সহজ কাজ সহজে করা যায় না। দুদিন গেল, পাঁচ দিন গেল এবং ফেব্রুয়ারি মাস শেষ হয়ে গেল কিন্তু অধ্যাপক আজাদ খানের তরফ থেকে কোন জবাব আমি পেলাম না। উনি ব্যস্ত মানুষ সন্দেহ নেই, কিন্তু একটা ইমেইলের জবাব দেবার সময়ও হচ্ছেনা দেখে একটু ধাঁধায় পড়ে গেলাম। এমনওতো হতে পারে যে উনি হয়তো সরাসরি ডাঃ আনউইন কে ইমেইল করেছেন আমাকে বাদ দিয়ে, তাই না? নিশ্চিত হতে তাই ডাঃ আনউইন কে আমি জিজ্ঞেস করলাম যে তিনি কোন জবাব পেয়েছেন কিনা। জবাবে তিনি জানালেন যে, ওনিও কোন ইমেইল পাননি।
অগত্যা আমি অধ্যাপক আজাদ খান কে ফোন করে নিশ্চিত হতে চাইলাম যে তিনি ডাঃ আনউইনের ইমেইলটি পেয়েছেন কিনা। তিনি জানালেন যে তিনি ইমেইল পেয়েছেন! সাথে আরো বললেন যে, ডাঃ আনউইনের মতোই আরেকটি গবেষণা ওনারা বাংলাদেশ ডায়বেটিক সমিতির উদ্যোগে করার কথা ভাবছেন এবং আরো অনেক কথা!
মনটা খারাপ হয়ে গেল। বুঝলাম যে তিনি আসলে জবাব দেবেন না। মাঝখান থেকে আমি ডাঃ আনউইনের কাছে ছোট হয়ে গেলাম। তাছাড়া, অধ্যাপক আজাদ খানের অনুমতি নিয়ে একজন গুণী ডাক্তার এবং গবেষকের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার পরেও উনি যে জবাব দেবার সৌজন্যটুকু দেখালেন না, বিষয়টি আমার কাছে নিছক অভদ্রতার চিহ্ন বলে মনে হল।
২০২৪ সাল গিয়েছে, ২০২৫ সালও প্রায় শেষ হয়ে এলো। সামনে ১৪ই নভেম্বর, বিশ্ব ডায়বেটিস দিবস! ফেসবুক থেকে দেখতে পাচ্ছি বাংলাদেশ ডায়বেটিক সমিতি স্বারম্বরে দিবসটি পালনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই দিবস কে কেন্দ্র করে তারা যে প্রচারপত্র বানিয়েছেন, সেখানে দেখলাম আর্থিক সহযোগিতা দিচ্ছে কতগুলো ফার্মা কোম্পানি। প্রচারপত্রে ডায়বেটিস রোগ সম্পর্কে সেই পুরাতন ভ্রান্ত ধারনা আর মিথ্যাচার! টাইপ ২ ডায়বেটিক রোগীদের সেই একইভাবে ইনসুলিন ব্যবহার করে রক্তের চিনি নিয়ন্ত্রণের উপদেশ! আকাশটা যেন হতাশার মেঘে ঢেকে গেল!
চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের একটি বিশেষ প্রতিজ্ঞা করে কর্মজীবন শুরু করতে হয়। তারা প্রতিজ্ঞা করেন যে, রোগীর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে এমন কোন কাজ তারা করবেন না বা কোন উপদেশ তারা দেবেন না। আমি পূর্বে যে চিঠিটির কথা উল্লেখ করেছি, সেটা পড়লে পাঠক জানতে পারবেন যে আমেরিকার ব্রিঘাম ইয়ং ইউনিভারসিটির প্রফেসর এবং মেটাবলিক বিজ্ঞানী ডঃ বেন বিকম্যান একাধিক গবেষণায় প্রকাশিত উপাত্তের ভিত্তিতে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন যে, ২য় ধরনের ডায়বেটিক রোগীকে ইনসুলিন দিয়ে চিকিৎসা করা হচ্ছে তার রক্তের চিনির মাত্রা স্বাভাবিক রেখে তাকে কবরের দিকে ঠেলে দেয়া। এই বিষয়ে অধ্যাপক আজাদ খান কে জিজ্ঞেস করলে, তিনি বলেছিলেন যে তিনি ডায়বেটিস বিশেষজ্ঞ নন এবং তাই কোন মন্তব্য করতে পারবেন না।
মনে কত কথা, কত ভাবনা, কত প্রশ্ন এলো! ডায়বেটিস বিশেষজ্ঞ না হয়ে উনি তাহলে কেন ডায়বেটিস সমিতির সভাপতি হয়ে বসে আছেন? তার নেতৃত্বে এই প্রতিষ্ঠানটি ডায়বেটিস রোগীদের অকাল মৃত্যুর দিকে ঠেলে নিয়ে চলেছে। কত রোগীর হাত-পা কাটা পড়েছে, কত রোগীর গেছে চোখ, আরো কত শত রোগী অকালে হারিয়েছে প্রাণ! অথচ তিনি যদি শুধু চিকিৎসা বিজ্ঞানকে অনুসরণ করে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করতেন, কয়েক মাসের মধ্যে না হলেও বছরের মধ্যেই দেশের ডায়বেটিস রোগীগনের একটি বিরাট অংশ নাটকীয়ভাবে সুস্থ জীবন লাভ করতে পারতো। বেঁচে যেত কত সহস্র প্রাণ!
বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপক! কি ভীষণ সাফল্য! কত বড় সম্মান! কিন্তু, দেশ কে ডায়বেটিস মুক্ত করার এমন সুযোগ পেয়েও তিনি যখন তা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হলেন, শত সহস্র মানুষকে অকাল মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিলেন; তার সফলতা কি এক সমুদ্র ব্যর্থতার বিপরীতে এক বিন্দু জলের সমান নয়?